হাতি দেখার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে রাঙ্গামাটির পথে।

রাঙ্গামাটির (চট্টগ্রাম)

জীবনে একটা অবিশ্বাস ঘটনা ঘটে গেল। কল্পনা করিনি এমন একটা জায়গায় যেতে পারব, যেখানে মৃত্যুভয় আমাদের তাড়া করবে। মানুষ তাদের প্রাণ নিয়ে যেখানে ছোটাছুটি করে। রাঙ্গামাটির লংগদু থানার পাহাড়ে ঘেরা গহিন অরণ্যে হাতির নিত্যদিনের উপদ্রব। খবর পেয়েই আমরা ছুটলাম  হাতি দেখার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে রাঙ্গামাটির পথে।

আমরা বিটিইএফের ১০ জন এই অ্যাডভেঞ্চারাস যাত্রার জন্য রওনা দিলাম। সৌদিয়া বাসে রাত ১২টায় আমাদের যাত্রা শুরু। ভোরবেলা পৌঁছে গেলাম চট্টগ্রামের মুরাদনগরে। সেখান থেকে আবারও বাসে রাঙ্গামাটির পথে। ৬১১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা রাঙ্গামাটির আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ছুটে চলছি। দু’পাশে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। পৌঁছতে সময় লাগল প্রায় দু’ঘণ্টা।
হাতির খবরটা আমাদের প্রথম দিয়েছিল ‘প্রেকেতিক’। একটি সংবাদপত্র এবং চ্যানেলের প্রতিনিধি ফারুক আজম। আমরা তাকে প্রেকেতিক বলেই ডাকি। সকাল ১০.১০-এ আমরা পৌঁছে গেলাম রাঙ্গামাটির রিজার্ভ বাজারে। গ্রিন হোটেলে খেয়ে জুবিলি রোড লঞ্চঘাটের দিকে রওনা হলাম।

পানিপথে আমাদের যেতে হবে অনেকদূর। এমএল আয়শাতে যাত্রা করলাম শুভলঙ্গের দিকে। দু’পাশে উঁচু খাঁড়া পাহাড় আর জঙ্গল পেরিয়ে লঞ্চ চলতে থাকল। মাঝে মাঝে পাহাড়ে বিশাল গুহা, পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে নদীর পথ। কি অপূর্ব সেই দৃশ্য!

১.০৫-এ পৌঁছলাম শুভলঙ্গ বাজারে। সেখান থেকে পায়ে হাঁটা প্রায় ১০ মিনিটের পথ হেঁটে আবার লঞ্চে উঠলাম। এখন যাব মীনাবাজার। আবার সেই পাহাড়ের ফাঁকে নদীর আঁকাবাঁকা পথ। ৩.৩০-এ কাকতলী থামল লঞ্চ। এর এক ঘণ্টা পরই মীনাবাজার। আমরা এখান থেকে আরও দূরে যাব বৈরাগী বাজার। সেখান পর্যন্ত বড় লঞ্চ যায় না। কারণ খালে পানি কম। জুলাই-আগস্টে চারপাশে পানিতে থৈ থৈ করে। তখন এক লঞ্চেই বৈরাগী বাজার পর্যন্ত যাওয়া যায়। একটা ছোট্ট ট্রলারে রওনা হলাম। এক জায়গায় পানি কম সেখানে কিছু ছেলে এই ট্রলারগুলো দড়ি দিয়ে টেনে পার করে দেয়। বিনিময়ে কিছু পয়সা পায়। বৈরাগী বাজার পৌঁছতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে গেল। তখন প্রচণ্ড ক্লান্ত, হোটেলে ঢুকতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হল আর নতুন ধরনের খাবারের স্বাদও নিলাম। সেখানের রসপুরি কামরুল ভাইকে বেশ আকৃষ্ট করেছে। রসের মধ্যে ডোনাটের মতো বন, একেই বলে রসপুরি। আরও আছে মালাই দেওয়া চা।

প্রচুর বৃষ্টি, তাই তাঁবুতে থাকার পরিকল্পনা বাদ। প্রেকেতিকের নির্দেশনায় এক মাদ্রাসায় রাত কাটাবো আমরা। মহাজনপাড়ায় আবদুল মজিদের ঘরে আমরা খেলাম আর তার কাছ থেকে হাতির গল্প শুনলাম। এরা বেশি আসে আম-কাঁঠালের দিনে। বাধা দিলেই সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এসব পাহাড়ে আরও আছে গেছোবাঘ, হরিণ, অজগর এবং আরও অনেক প্রাণী।
পরদিন সকালে গেলাম বৈরাগী বাজারে। সেদিন ছিল শুক্রবার, হাটের দিন। এসব পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ি, চাকমা লোকজনের চেয়ে বাঙালিই বেশি। বিভিন্ন জেলা থেকে এসে তারা পাহাড়ে বসবাস করছে। দুপুর ১২.১৫-এ আমরা রওনা দিলাম রাঙ্গীপাড়ার দিকে। পাহাড়, সমতল, জঙ্গল সব পার হয়ে ছুটে চলেছি। চলতে চলতে আমরা পার হয়েছি রাঙ্গীপাড়া বীট, পাবলাখালী রেঞ্জ, টেংটুং পাহাড়, কাকপাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুলশাখালী। এসব পার হয়ে যাওয়ার পথে চোখে পড়ল অনিন্দ্য সুন্দর লেক। তখন বাজে ১.১৫। আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে সেখান থেকে হাতির অভয়ারণ্য শুরু। মান্নান আমাদের সবদিকে সাবধান করে দিল। হাতি দেখলেই সব কিছু ফেলে দৌড় দিতে হবে। তবে সোজাসুজি নয় একেবারে নব্বই ডিগ্রি এঙ্গেলে। না হলে আর আস্ত রাখবে না মামারা। হাতির পায়ের ছাপ দেখলাম, গুঁড়িয়ে দেওয়া ঘর দেখলাম, আরও দেখলাম হাতি তাড়ানোর জন্য তৈরি করা টংঘর। অনেক পথ টিপটিপ বৃষ্টিতে হেঁটে কাকপাড়িয়া বাজার থেকে ভেনে চড়লাম সবাই রাজনগর বিডিআর ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। আগেই আমরা ক্যাম্পের নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে ক্যাম্প থেকে বের হলাম। তখন বাজে প্রায় ৫টা। ধীর পায়ে নিশ্চুপভাবে পথ ধরলাম উঁচু পাহাড়ের। হাতিগুলো বেশি দেখা যায় রূপনগর, বগাচত্বর, গুলশাখালী, ভাসাইনাদম এসব এলাকায়। এখানে প্রায় ৪০ হাজার লোকের বাস। আমরা এখন রূপনগর দিয়ে যাচ্ছি। গাছ একটু নড়ে উঠলেই মনে হচ্ছে এই বুঝি হাতি এলো রে। কিছুদূর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে হাঁটার পর আমরা বুড়িরটেক এলাম। হাতির অভয়ারণ্য কাছেই।

উঁচু পাহাড়ের টিলা থেকে আস্তে আস্তে একে একে নিচে নামলাম। একটিলা থেকে অন্য টিলার দূরত্ব বেশি না। মাঝে সমতল আবার টিলা। আমি, কিশোর ভাই, রিপন ভাই, ফারুক আজম সবার ক্যামেরা রেডি। মিটিমিটি পায়ে অনেকটুকু কাছে গেলাম। ওই তো মাঝারি সাইজের একটি হাতি জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে বের হল। আমাদের দেখেছে কিনা জানি না। ছবি তোলার জন্য বুকে সাহস নিয়ে যতদূর পারলাম গেলাম। কিন্তু সন্ধ্যা প্রায়, আলোর এত স্বল্পতা যে ভালো করে তুলতেও পারলাম না। এর ভেতর আবার কোন্ সময় হাতির পাল এসে ধাওয়া দেয় এ জন্য দূরে দাঁড়িয়ে দৌড়ের জন্য পজিশন নিয়ে ছিল গনি ভাই, পল্লব ভাই, উজ্জ্বল ভাই, সালাউদ্দীন ভাইসহ অন্যরা। দেখলেই দে দৌড়। কিছুক্ষণ পরই পাশের টিলার দিকে চোখ পড়তেই দেখি হাতিদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। সবাই দিলাম এক দৌড়। একদম নিরাপদ স্থানে। সেখান থেকে দেখলাম একসঙ্গে অনেক হাতি। রাতে সেই টিলাতে তাঁবু হবে এবং বারবিকিউ হবে এমনটাই প্ল্যান ছিল, কিন্তু আমরা ক্যাম্পে ফিরে গেলাম। যাই হোক এত কষ্টের পরও হাতি তো দেখা হল। রাতে ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে আর ক্যামেরা নিয়ে রিপন ভাই নিশ্চুপ। কাছে যেতেই ইশারা দিল কথা বলবি না, কারণ ক্যামেরায় সব ধরা পড়ে যাবে। রাত গভীর হলে হাতি এসেছিল পাশের গ্রামে। কান্নাকাটির আওয়াজও পেয়েছিলাম, তবে কোনও প্রাণহানি ঘটেনি। গত ১৫ বছরে এই লংগদুতে প্রায় ৫০০ জন নিহত আর পঙ্গু হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন।
পরদিন সকাল ৮টায় সবাই বের হয়ে গেলাম ঢাকার উদ্দেশে। আবার সেই পাহাড়ি রাস্তা, অপূর্ব নীল আকাশ, ছোট ছোট খাল, ধানক্ষেত। দেশটা যে এত সুন্দর ভাবা যায় না। বেশ খানিকক্ষণ হাঁটার পর পানি খেলাম আবদুর রহিমের বাড়িতে। যার বয়স ১০৭, তার স্ত্রীরও প্রায় ১০০’র কাছাকাছি। শক্ত-সামর্থ্য এত বয়সের মানুষ খুব কম দেখেছি।

 

Credit: touristguide24 and বিটিইএফ